পিসির বেড়াল গিয়েও যায় না!
হ্যাঁ, ফুলপিসি আর এডওয়ার্ডের কথা বলছি। সেই ছবিতে পিসির বেড়ালের কথা মনে আছে তো? তা সেই বেড়াল শিবপ্রসাদের পিছু ছাড়ছে না কিছুতেই। তাঁর নতুন ছবি বহুরুপী দ্য গোল্ডেন ডাকু দেখে আসুন। দেখবেন, বেড়াল কখন মাছ খাচ্ছে! দেখার মতো করে দেখলে জানবেন বেড়াল কখন টুক করে ঝুলিতে ঢুকে পড়েছে আর কীভাবে কখন বেরিয়েও পড়ছে ঝুলি থেকে। ছবিতে বহুরুপী ডাকুর দাম্পত্য, সংসার, সন্তান দেখবেন। শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, আলাদা করে বলার কিছু নেই। কৌশানী, এবারও সুন্দর। ছবিতে ওদের সন্তান, শিশুশিল্পি, সে ও দারুন। ভালো ভালো যা দেখার, ছবিতে সবই দেখবেন। বহুরুপীর দল, গম্ভীরার দল, উপরি পাওনা পার্বতী বাউল। সঙ্গে আবার শিলাজিৎ। তার ওপর রজতাভ দত্ত, যীশু, সোহিনী একেবারে মার মার কাট কাট।
এসব তো আপনি দেখবেন। এবার আসি দেখার মতো দেখায়। ডাকাতি ছাড়া, ডাকু পুলিশের লড়াই ছাড়া, ছবির মূল বিষয় দুর্নীতি। বেধড়ক দুর্নীতি। কোথাকার দুর্নীতি? অবশ্যই বাংলার। কবেকার দুর্নীতি? ছবি শুরুতে লেখা আছে, সময়কাল ২০১৭ থেকে ২০১৯। (মোটামুটি এইরকম। এক ঝলক দেখেছি। মোটামুটি এইরকম।) এই ঘোষনার সঙ্গে সঙ্গে ছবিতে ঢুকে পড়ল কী? ঠিক ধরেছেন, রাজনীতি।
এরপর আলোচনাটা এগোনোর আগে একটু ছবির শ্যুটিং এর সময়কাল টা একবার দেখে নিন।
২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল (বাংলা নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখের শুভ দিনে) ছবিটির মহরৎ এবং আনুষ্ঠানিক শ্যুটিং শুরু হয়।
মূল সময়কাল: ২০২৬ সালের এপ্রিল এবং মে মাস জুড়ে ছবিটির মূল অংশের শ্যুটিং করা হয়েছে। লোকসভা নির্বাচনের কারণে শুরুতে পরিকল্পনায় কিছুটা দেরি হলেও, পরবর্তীতে মে মাসের তীব্র গরমের মধ্যেই টিম 'বহুরূপী' আউটডোর শিডিউলের কাজ সম্পন্ন করে।
২০২৬ এর এপ্রিল। ভোটের রেজাল্ট বেরোবে মে মাসের চার তারিখ। শোনা যায় এবারের সরকার বদলের খবর যেমন আমলাস্তরে ছিল, তেমনই নাকি তৃণমূলের অনেক ডান হাতের কাছেও ছিল, আর শিল্পপতিদের কাছে তো ছিলোই। একমাত্র যারা রাজনীতির অঙ্ক আর রসায়ন বিচার করে হিসেব কষেছিলেন তাঁদের কাছে বিজেপির জেতার খবর ছিল না। এখন প্রশ্ন তাহলে কি টলিউডেও এই খবর আগে থেকেই ছিল? কেন এই প্রশ্ন? ফিরে আসি আগের কথায়। দুর্নীতির গল্প বলা ছবিতে ঘটনার সময়কাল উল্লেখ করেছেন পরিচালক। খুব দরকার ছিল? দুর্নিতি কোনও সময়কালে বাঁধা আছে নাকি? তাহলে? তাহলে আর কি, ছবির স্ক্রুটিনিতে ধরা পড়েছে এই ছবি যখন মানুষ দেখবে তখন রাজ্যে পালাবদল হয়ে গেছে! আর এমন দুর্নীতি নতুন সরকারের আমলে! ইস! নতুন সরকার সম্পর্কে জনমানসে কেমন খারাপ একটা ধারনা হবে! তাই না? তাহলে উপায়? উপায় একটাই, দুর্নীতিকে সময় দিয়ে বেঁধে ফেলতে হবে। কেমন সময়? যখন তৃণমূলে অভিষেকের উত্থান সম্পূর্ণ, অবস্থান মধ্য গগনে। সুতরাং, শিবপ্রসাদ বাবু দুর্নীতির সময়টা সেই সময়ে বেঁধে ফেলুন!এমন করে কেউ বলেছিল নাকি?
সিনেমার প্রতি সন্দেহটা মনের মধ্যে দানা বেঁধে যায় প্রথমেই। শিবপ্রসাদের মতো শিল্পি নিজের শিল্পকে সময়সীমার ওপারে না ঠেলে এমনি এমনি সীমানা বেঁধে দিলেন!
মনে সন্দেহ নিয়ে সিনেমা দেখা শুরু হয়ে যাবে। সুন্দর সিনেমা। শিবপ্রসাদ যে ভাবে চপ ভাজেন আর কী! মোচার চপে দু'টুকরো নারকোল, চারটে বাদাম আপনি পাবেনই। যেমন আলুর চপে পাবেন আমাদা। ফুলুরিতে পরিমান মতো কাঁচা লঙ্কার কুচি।
দুর্নীতির ছবি যেভাবে এঁকেছেন তা পারফেক্ট। কোনও এক অদৃশ্য নেতার প্রতিনিধিদের যে সফিসটিকেসনের মোড়কে দেখিয়েছেন, সেটাও পারফেক্ট। পুলিশের ওপর কোনও এক অদৃশ্য শক্তির অদম্য চাপ ও দুর্নীতির টাকা সাপ্লাই, যেভাবে দেখিয়েছেন, সেটাও পারফেক্ট। কিন্তু গুরু উত্তম তো কবেই বলে গেছেন, যে দুধে কেরোসিনের গন্ধ, সে দুধ তোমাদের গিলতে হয় গেলো, আমি গিলব না। ঠিক ধরেছেন, অগ্নিশ্বর। এই ছবিতে অবশ্য গুরু নেই, আছেন মহাগুরু। আবার ঠিক ধরেছেন, মিঠুন চক্রবর্তী। সিনেমাতে অপ্রয়োজনীয় (বাংলার সিনেমার প্রয়োজন থাকতে পারে!) একটা দৃশ্যের অবতারনা করে দর্শককে সারপ্রাইজ দিয়েছেন শিবপ্রসাদ। যেখানে মিঠুন বলছেন, আর বহুরুপী গ্যাং নয়, এবার বাংলা গ্যাং।
ঠিক তখনই কি ঝুলির ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ল ফুলপিসির বেড়াল?
সিনেমাটা যাঁরা দেখেছেন তাঁরা এই প্রশ্নের উত্তর দেবেন। যাঁরা দেখেননি তাঁরা শীঘ্র দেখে ফেলুন।