সকলকে শারদীয়ার শুভেচ্ছা জানিয়ে পিতৃপক্ষের অবসানে পিতৃতন্ত্র অবসানের প্রার্থনা করতে করতে মনে আসা একটা প্রশ্ন আপনাদের বলি।
আজ মহালয়া। আজ পিতৃপুরুষকে জল খাওয়াবার দিন। গঙ্গার ঘাটে ঘাটে সরস্বতী পুজোর মতো আজও পুরোহিতের কদর কম নয়। কথা হচ্ছে এই যে আপনি আজ পিতা পিতামহ প্রপিতামহকে জল দান করবেন, আপনি কি নিশ্চিত আপনার পিতামহ বা প্রপিতামহ কি আপনার দেওয়া জল গ্রহন করতে পারবেন? তিনি তো এতদিনে জন্মে গেছেন। আজ স্কুল ছুটি তাই টিভিতে মহিষাসূর বধ দেখছেন! কী করে আপনার জল খাবেন? হিন্দু দর্শন তো জন্মান্তরের কথা বলে। তাহলে মহালয়ায় পিতৃপুরুষের আগমন আর জন্মান্তর, দুটোই একসঙ্গে সত্যি হয় কী করে?
না। ব্যাপারটা অতটা সহজ নয়।
এই সনাতন ধাঁধার উত্তর মীমাংসা ও সাংখ্য দর্শনে এক প্রকার পাওয়া যায়। যা পাওয়া যায় তা সত্য হতেও পারে কিন্তু বিশ্বাস না থাকলে সেই 'সত্যকে' সত্য বলে মানা কঠিন। তাই বেদ বা গীতা থাক। আসুন দেখে নিই আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায় কোয়ান্টাম তত্ত্বে মহালয়ার রহস্যের কোনও হদিশ পাওয়া যায় কিনা?
হিন্দু বেদান্ত দর্শন স্পষ্ট করে বলে, আত্মা কোনও শরীরী অস্তিত্ব বা ভূত-প্রেত নয়; আত্মা হলো শুদ্ধ চেতনা (Pure Consciousness)। আর এই চেতনার স্তরে সময় কোনো সরলরেখা নয়, বরং বৃত্তাকার। আমাদের প্রপিতামহ হয়তো বহু বছর আগেই অন্য কোনো রূপে, অন্য কোনো শরীরে পুনর্জন্ম নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর যে মূল অস্তিত্ব, তাঁর জীবনকাল, কর্ম এবং স্মৃতির যে তরঙ্গ, তা মহাবিশ্বের সমষ্টিগত শক্তি ক্ষেত্রে (Cosmic Field) চিরকালের জন্য সংরক্ষিত হয়ে গেছে।
কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এই তত্ত্বকেই আমরা বলতে পারি এক অনন্ত মহাজাগতিক তথ্যভাণ্ডার। মহালয়ার দিন আকাশ থেকে কোনও অবয়ব নেমে আসে না, বরং স্থান ও কালের সীমানা পেরিয়ে আমরা আমাদের চেতনার দ্বারা সেই উৎসের সঙ্গে যুক্ত হই।
এই যোগাযোগের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করা যায় কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার ‘কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট’ (Quantum Entanglement) দিয়ে।
এই তত্ত্ব বলে, দুটি কণা যদি অতীতে কখনো একে অপরের সংস্পর্শে এসে যুক্ত থাকে, তবে পরবর্তীতে তাদের কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে সরিয়ে দিলেও তারা এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা থাকে। একটি কণার ওপর কোনও পরিবর্তন ঘটালে, অপর কণাটি মুহূর্তের মধ্যে (আলোর গতির চেয়েও দ্রুত!) তার প্রতিক্রিয়া দেখায়। আলবার্ট আইনস্টাইন একেই কিছুটা বিস্ময়ের সঙ্গে বলেছিলেন ‘Spooky action at a distance’।
জৈবিকভাবে আমাদের প্রত্যেকটি কোষের ভেতরে, আমাদের ডিএনএ-তে (DNA) আমাদের পূর্বপুরুষদের উপাদানের এই ‘এনট্যাঙ্গেলমেন্ট’ বা সূক্ষ্ম কোয়ান্টাম সংযোগ রয়ে গেছে। প্রপিতামহ আজ পরজন্মে পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, মহালয়ার দিন যখন আমরা সম্পূর্ণ একাগ্র চিত্তে তাঁর উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতার শক্তির তরঙ্গ বা তর্পণ পাঠাই, কোয়ান্টাম নিয়মে সেই স্পন্দন মুহূর্তের মধ্যে তাঁর বর্তমান অস্তিত্বকে স্পর্শ করে।
এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ‘অবসার্ভার ইফেক্ট’ (Observer Effect)।
নোবেলজয়ী পদার্থবিদ ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক চেতনাকে মহাবিশ্বের মৌলিক উপাদান বলে গণ্য করেছিলেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যতক্ষণ না কোনও পর্যবেক্ষক (Observer) কোনও তরঙ্গের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, ততক্ষণ তা মহাবিশ্বে কেবল একটি ‘সম্ভাবনা’ হিসেবে ছড়িয়ে থাকে। মনোযোগ দিলেই সেই তরঙ্গ ঘনীভূত হয়ে বাস্তব কণার রূপ নেয়। বছরের বাকি দিনগুলোতে আমরা জাগতিক কোলাহলে ব্যস্ত থাকি। কিন্তু মহালয়ার শুভ ক্ষণে যখন কোটি কোটি মানুষ একই ফ্রিকোয়েন্সিতে, একই সময়ে তাদের উৎসকে স্মরণ করে, তখন আমাদের সেই ‘যৌথ চেতনা’ বা যৌথ মনোযোগের কারণে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা পূর্বপুরুষদের স্মৃতির তরঙ্গটি ঘনীভূত হয়ে ওঠে। একেই শাস্ত্রীয় ভাষায় বলা হয়েছে ‘আত্মার আগমন’।
সাম্প্রতিক কোয়ান্টাম বায়োলজি (Quantum Biology) আমাদের জানাচ্ছে, মানুষের ডিএনএ কেবল রাসায়নিক কোড নয়, এটি একটি জৈব-কোয়ান্টাম কম্পিউটার, যা পূর্বপুরুষদের মানসিক সংস্কার, স্মৃতি এবং ট্রমা বহন করে চলে। সনাতন দর্শনে একেই ‘পিতৃঋণ’ বা ‘পিতৃদোষ’ বলা হয়েছে। মহালয়ার তর্পণ আসলে মৃত ব্যক্তির জন্য যতখানি, তার চেয়ে অনেক বেশি জীবিত বংশধরের নিজের জন্য। তর্পণের অর্থ ‘তৃপ্ত করা।' শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার জল দিয়ে আমরা আসলে আমাদের নিজেদের ভেতরের সেই অবচেতন কোয়ান্টাম মেমোরি বা ঋণাত্মক সংস্কারগুলোকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করি।
।সকলকে শারদীয়ার শুভেচ্ছা জানিয়ে পিতৃপক্ষের অবসানে পিতৃতন্ত্র অবসানের প্রার্থনা করতে করতে মনে আসা একটা প্রশ্ন আপনাদের বলি।
আজ মহালয়া। আজ পিতৃপুরুষকে জল খাওয়াবার দিন। গঙ্গার ঘাটে ঘাটে সরস্বতী পুজোর মতো আজও পুরোহিতের কদর কম নয়। কথা হচ্ছে এই যে আপনি আজ পিতা পিতামহ প্রপিতামহকে জল দান করবেন, আপনি কি নিশ্চিত আপনার পিতামহ বা প্রপিতামহ কি আপনার দেওয়া জল গ্রহন করতে পারবেন? তিনি তো এতদিনে জন্মে গেছেন। আজ স্কুল ছুটি তাই টিভিতে মহিষাসূর বধ দেখছেন! কী করে আপনার জল খাবেন? হিন্দু দর্শন তো জন্মান্তরের কথা বলে। তাহলে মহালয়ায় পিতৃপুরুষের আগমন আর জন্মান্তর, দুটোই একসঙ্গে সত্যি হয় কী করে?
না। ব্যাপারটা অতটা সহজ নয়।
এই সনাতন ধাঁধার উত্তর মীমাংসা ও সাংখ্য দর্শনে এক প্রকার পাওয়া যায়। যা পাওয়া যায় তা সত্য হতেও পারে কিন্তু বিশ্বাস না থাকলে সেই 'সত্যকে' সত্য বলে মানা কঠিন। তাই বেদ বা গীতা থাক। আসুন দেখে নিই আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায় কোয়ান্টাম তত্ত্বে মহালয়ার রহস্যের কোনও হদিশ পাওয়া যায় কিনা?
হিন্দু বেদান্ত দর্শন স্পষ্ট করে বলে, আত্মা কোনও শরীরী অস্তিত্ব বা ভূত-প্রেত নয়; আত্মা হলো শুদ্ধ চেতনা (Pure Consciousness)। আর এই চেতনার স্তরে সময় কোনো সরলরেখা নয়, বরং বৃত্তাকার। আমাদের প্রপিতামহ হয়তো বহু বছর আগেই অন্য কোনো রূপে, অন্য কোনো শরীরে পুনর্জন্ম নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর যে মূল অস্তিত্ব, তাঁর জীবনকাল, কর্ম এবং স্মৃতির যে তরঙ্গ, তা মহাবিশ্বের সমষ্টিগত শক্তি ক্ষেত্রে (Cosmic Field) চিরকালের জন্য সংরক্ষিত হয়ে গেছে।
কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এই তত্ত্বকেই আমরা বলতে পারি এক অনন্ত মহাজাগতিক তথ্যভাণ্ডার। মহালয়ার দিন আকাশ থেকে কোনও অবয়ব নেমে আসে না, বরং স্থান ও কালের সীমানা পেরিয়ে আমরা আমাদের চেতনার দ্বারা সেই উৎসের সঙ্গে যুক্ত হই।
এই যোগাযোগের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করা যায় কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার ‘কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট’ (Quantum Entanglement) দিয়ে।
এই তত্ত্ব বলে, দুটি কণা যদি অতীতে কখনো একে অপরের সংস্পর্শে এসে যুক্ত থাকে, তবে পরবর্তীতে তাদের কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে সরিয়ে দিলেও তারা এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা থাকে। একটি কণার ওপর কোনও পরিবর্তন ঘটালে, অপর কণাটি মুহূর্তের মধ্যে (আলোর গতির চেয়েও দ্রুত!) তার প্রতিক্রিয়া দেখায়। আলবার্ট আইনস্টাইন একেই কিছুটা বিস্ময়ের সঙ্গে বলেছিলেন ‘Spooky action at a distance’।
জৈবিকভাবে আমাদের প্রত্যেকটি কোষের ভেতরে, আমাদের ডিএনএ-তে (DNA) আমাদের পূর্বপুরুষদের উপাদানের এই ‘এনট্যাঙ্গেলমেন্ট’ বা সূক্ষ্ম কোয়ান্টাম সংযোগ রয়ে গেছে। প্রপিতামহ আজ পরজন্মে পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, মহালয়ার দিন যখন আমরা সম্পূর্ণ একাগ্র চিত্তে তাঁর উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতার শক্তির তরঙ্গ বা তর্পণ পাঠাই, কোয়ান্টাম নিয়মে সেই স্পন্দন মুহূর্তের মধ্যে তাঁর বর্তমান অস্তিত্বকে স্পর্শ করে।
এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ‘অবসার্ভার ইফেক্ট’ (Observer Effect)।
নোবেলজয়ী পদার্থবিদ ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক চেতনাকে মহাবিশ্বের মৌলিক উপাদান বলে গণ্য করেছিলেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যতক্ষণ না কোনও পর্যবেক্ষক (Observer) কোনও তরঙ্গের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, ততক্ষণ তা মহাবিশ্বে কেবল একটি ‘সম্ভাবনা’ হিসেবে ছড়িয়ে থাকে। মনোযোগ দিলেই সেই তরঙ্গ ঘনীভূত হয়ে বাস্তব কণার রূপ নেয়। বছরের বাকি দিনগুলোতে আমরা জাগতিক কোলাহলে ব্যস্ত থাকি। কিন্তু মহালয়ার শুভ ক্ষণে যখন কোটি কোটি মানুষ একই ফ্রিকোয়েন্সিতে, একই সময়ে তাদের উৎসকে স্মরণ করে, তখন আমাদের সেই ‘যৌথ চেতনা’ বা যৌথ মনোযোগের কারণে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা পূর্বপুরুষদের স্মৃতির তরঙ্গটি ঘনীভূত হয়ে ওঠে। একেই শাস্ত্রীয় ভাষায় বলা হয়েছে ‘আত্মার আগমন’।
সাম্প্রতিক কোয়ান্টাম বায়োলজি (Quantum Biology) আমাদের জানাচ্ছে, মানুষের ডিএনএ কেবল রাসায়নিক কোড নয়, এটি একটি জৈব-কোয়ান্টাম কম্পিউটার, যা পূর্বপুরুষদের মানসিক সংস্কার, স্মৃতি এবং ট্রমা বহন করে চলে। সনাতন দর্শনে একেই ‘পিতৃঋণ’ বা ‘পিতৃদোষ’ বলা হয়েছে। মহালয়ার তর্পণ আসলে মৃত ব্যক্তির জন্য যতখানি, তার চেয়ে অনেক বেশি জীবিত বংশধরের নিজের জন্য। তর্পণের অর্থ ‘তৃপ্ত করা।' শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার জল দিয়ে আমরা আসলে আমাদের নিজেদের ভেতরের সেই অবচেতন কোয়ান্টাম মেমোরি বা ঋণাত্মক সংস্কারগুলোকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করি।
তর্পণ আসলে পিতৃপুরুষকে জল দেওয়া নয়। তর্পণ হলো নিজের ভেতরে বয়ে চলা পিতৃতন্ত্রের যে অবচেতন সংস্কার, যে ভয়, যে ঋণ, তাকেই শ্রদ্ধার জলে ধুয়ে ফেলা। তাই পিতৃপক্ষের অবসানই হোক পিতৃতন্ত্রের অবসানের শুরু। আপনারা কী বলেন?
(এই লেখা বিশ্বাস করতে হবে এমন কোনও কথা নেই। কোয়ান্টাম তত্ত্ব, সেটিও বিতর্কের উর্দ্ধে নয়।)