উমর খালিদের পুরস্কার, তাঁর লড়াইয়ের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এ কথা অনেকের কাছে সহজ সত্য হলেও ভারত সরকারের কাছে বিষয়টা তেমন সহজ নয়। শুধুমাত্র ভারত সরকার নয়, এক শ্রেনীর সংবাদমাধ্যমের অনবরত দমাদমের ফলে সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশ তাঁকে বাঁকা চোখেই দেখে!
প্রশ্ন উঠছে, সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে ভারতের কারাবন্দী অধিকারকর্মী উমর খালিদকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা 'ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্স' ২০২৬ সালের 'অ্যাওয়ার্ড ফর হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স অ্যাট রিস্ক' সম্মানে ভূষিত করার ফলে কূটনৈতিক ভাবে ভারত কি অস্বস্তিতে পড়ল? এই প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ বা না এ দেওয়া মুশকিল। কারন, এমন নয় যে খালিদ সম্মানিত হতেই পৃথিবীর শক্তিধর দেশগুলো ভারতের সঙ্গে আড়ি করে দেবে! বহিরঙ্গে ভারতের বা নির্দিষ্ট করে বলা ভালো বর্তমান ভারত সরকারের কিছু এসে যাবে না। কারন বর্তমান সরকার ও বর্তমান শাসকদলকে অনেকে অনেক কথা বলে আক্রমন করলেও, শাসক দল কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমের সহযোগিতায় সাধারণের মনের মধ্যে ঢূকিয়ে দিয়েছে, সবার আগে দেশ। সবার উপরে মানুষ সত্য, সচেতন মানুষের সাবেক এই ভাবনায় দেশের মানচিত্র, সীমানা, কাঁটাতার প্রথমে আসে না। প্রথমে আসে মানবতা। সবার আগে দেশ, এই ভাবনাতেও যদি সততা থাকত তাহলেও একপ্রকার হতো! সরকার স্পনসর্ড দেশ ভাবনায় দেশ বলতে বোঝানো হয় দেশ চালানোর দায়িত্বে থাকা রাজনৈতিক দল বা ক্ষমতার শীর্ষে থাকা কোনও ব্যক্তি। এই প্রবণতা আরও মারাত্মক। তাই উমরের আন্তর্জাতিক সম্মানে কূটনৈতিক ভাবে যে অস্বস্তি হবার কথা, বোধের অনুপস্থিতির কারনে তাদের অস্বস্তিবোধ হবে না।
তাই ভারতের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলের একটি বড় অংশের মতে, উমর খালিদকে দেওয়া এই পুরস্কার ভারতের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়া এবং সার্বভৌমত্বের ওপর এক ধরণের অবাঞ্ছিত আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ। ভারত সরকার বরাবরই এই অবস্থান বজায় রেখেছে যে, দেশের আইন-শৃঙ্খলা এবং সন্ত্রাসবিরোধী কঠোর পদক্ষেপ সম্পূর্ণ দেশের আদালতের এক্তিয়ারভুক্ত। দিল্লির দাঙ্গার মতো সংবেদনশীল ঘটনায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বজায় রাখার তাগিদে যে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা কোনও বিদেশি সংস্থার সার্টিফিকেটের ওপর নির্ভর করে না। ফলে, এই পুরস্কারকে ভারতের সরকারি মহল আইনি প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার একটি বাহ্যিক চেষ্টা হিসেবেই দেখছে। শুধু দেখছে না দেখাচ্ছেও। তারা খুব ভালো করে জানে দেশের পড়াশোনা জানা, ভালো চাকুরে, প্রকাশ্যে না হলেও ভেতরে ভেতরে পরধর্মবিদ্বেষী এবং যে কোনও ঘটনাকে ধর্মের অ্যাঙ্গেলে দেখে সেই ঘটনাকে সাধারণীকরনের বদ-অভ্যাস এই শ্রেনীর মানুষের বিলক্ষণ আছে। এবং এদের সংখ্যাও নেহাৎ কম নয়। তাই উল্টো মতের লোকেদের দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দেওয়াও খুব সহজ হয়ে যায়।
এইসব তালে গোলে, ঝালে ঝোলে অম্বলে মজে থাকা কোনও ব্যবস্থার উমরের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে কেনই বা কিছু এসে যাবে?
এসে যাচ্ছে কাদের বা কার? যদি ধরেনি ভারতমাতা বলে সত্যিই একজন মানবী আছেন। যিনি আমাদের অলক্ষ্যে দেশের গ্রাম থেকে গ্রামে, বন থেকে বনান্তরে, শহরের আনাচেকানাচে ঘুরে বেড়ান চোখে জল আর বুকে বেদনা নিয়ে, তাহলে এসে যাচ্ছে তাঁর!
যে মানুষ ভারতের গণতন্ত্র নিয়ে গর্ব করে। যে মানুষ এখনও মানতে পারে না, বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশে রাজনীতির খেলোয়াড়রা গণতন্ত্রকে শুধুমাত্র নম্বরের খেলায় পরিণত করেছেন, শুধুই নাম্বার গেম, ভোটের অঙ্ক। তাদের এসে যাচ্ছে।
যে ভারত নিজেকে সর্বদা "বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র" এবং বহুত্ববাদের পীঠস্থান হিসেবে দাবি করে আসছে। এসে যাচ্ছে সেই ভারতের। আন্তর্জাতিক স্তরে উমর খালিদের মতো একজন বন্দিকে মানবাধিকার পদক দেওয়া বৃহত্তম গণতন্ত্রের দাবির সামনে একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।
২০২০ সালের দিল্লির দাঙ্গার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে কঠোর ইউএপিএ (UAPA) আইনের অধীনে দীর্ঘ ছয় বছর ধরে বিচার বা চার্জ গঠন ছাড়াই উমর খালিদের কারাবাসকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও থিঙ্ক-ট্যাঙ্কগুলো "বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতা" হিসেবে দেখাতে শুরু করেছে। এই ধরণের ঘটনা পাশ্চাত্য দেশগুলোতে ভারতের মানবাধিকার রেকর্ডকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে, যা ভারতের "সফট পাওয়ার" বা নৈতিক ভাবমূর্তিকে আঘাত করছে।
কিন্তু ভারত আর ভারত সরকার কি এক হলো নাকি?
এক নয় বলেই ভারতের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলের একটি বড় অংশের মতে, উমর খালিদকে দেওয়া এই পুরস্কার ভারতের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়া এবং সার্বভৌমত্বের ওপর এক ধরণের অবাঞ্ছিত আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ। ভারত সরকার বরাবরই এই অবস্থান বজায় রেখেছে যে, দেশের আইন-শৃঙ্খলা এবং সন্ত্রাসবিরোধী কঠোর পদক্ষেপ সম্পূর্ণ দেশের আদালতের এক্তিয়ারভুক্ত। দিল্লির দাঙ্গার মতো সংবেদনশীল ঘটনায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বজায় রাখার তাগিদে যে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা কোনও বিদেশি সংস্থার সার্টিফিকেটের ওপর নির্ভর করে না। ফলে, এই পুরস্কারকে ভারতের সরকারি মহল আইনি প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার একটি বাহ্যিক চেষ্টা হিসেবেই দেখছে।
এখন আবার আন্তর্জাতিক কূটনীতির যা সমীকরণ
বিশেষ করে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের কাছে ভারতের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। বাণিজ্যিক ও সামরিক স্বার্থের খাতিরে পাশ্চাত্য বিশ্বের রাষ্ট্রনেতারা এই ধরণের মানবাধিকার পুরস্কারের কারণে ভারতের সঙ্গে তাদের মূল কূটনৈতিক সম্পর্কে কোনও প্রভাব পড়তে দেবেন না।
এ কথা ঠিক যে উমর খালিদের এই আন্তর্জাতিক সম্মাননা ভারতের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা এবং ভিন্নমতের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে একটি সমালোচনার ঝড় তুলেছে। তবে এই মহল নিতান্তই বৌদ্ধিক মহল। পৃথিবীর চিন্তা-ভাবনা করতে পারা মানুষের ভিড় সেখানে। দেশের মাটিতে হেডলেস নিক আর হেডলেস হান্টদের নিয়ে যাদের কাজ চলে যায় আর বিদেশের মাটিতে আমেরিকা-ইউরোপের 'চিন ঠেকাও' বাধ্যবাধকতায় যারা অ্যাডভানটেজে রয়েছে, পৃথিবীর শিক্ষিত মানুষ কী বলল তাতে তাদের কী বা এসে গেল!
সার্বভৌম আইনি প্রক্রিয়া এবং বিশ্বমঞ্চের নৈতিক ভাবমূর্তির দ্বন্দ্ব! অনেকে বলছেন এমন কথা। তাঁরা মনে করছেন, ভারতের কূটনীতির জন্য এটাই বড় পরীক্ষা।
কী জানি!
আপনাদের কী মনে হয়?