কেন্দ্রে তখনও মোদিযুগ শুরু হয়নি। ইউপিএ ২ সরকার। আর রাজ্যে, মানে মহারাষ্ট্রে সরকার কংগ্রেসের। মুখ্যমন্ত্রী পৃথ্বিরাজ চহ্বান। গ্রেফতার হলেন একজন পোলিও প্রতিবন্ধি মানুষ। যাঁর শরীরের ৯০% অকেজো, তাঁকে গ্রেফতার করতে পৃথ্বিরাজ-পুলিশের সে কী টানা হ্যাঁচড়া! তাঁর হাত ধরে দিল এমনি টান যে দুর্বল মাংসপেশীতে আঘাত লেগে দুটো হাতও ক্ষতিগ্রস্ত হলো। যে মানুষটা হুইলচেয়ার ছাড়া চলতেই পারেন না, তাঁর সেই অন্ধের যষ্ঠি বাহনটিও গেল ভেঙে। কাকে গ্রেফতার করছে পুলিশ? জঙ্গি বুঝি? ভদ্রলোকের নাম জি এন সাইবাবা। ইংরেজির অধ্যাপক। মানবাধিকার কর্মী। মানবাধিকার! বললেই হবে মানবাধিকার? মানবাধিকার তো মুখোশ মশাই। ও মাওবাদী মাওবাদী মাওবাদী!!! মাওবাদী মানে কী? ওই যারা খুনটুন করে। ট্রেনফ্রেন ওড়ায়। পুলিশও বুঝে গেছে লোকটা খুনটুন, লোকটা ট্রেনফ্রেন! তাই এত নৃশংস। যেন শুধুমাত্র ডিউটি করছে না। একজন চলৎশক্তিহীন মানুষকে পশুর মতো টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে দেশমাতৃকার সুরক্ষা সুঠাম করছে!
সাইবাবা দলিত সমাজের পক্ষ নিয়ে কথা বলতেন। জল জমি জঙ্গলের ওপর আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হতেন। মনে মনে জঙ্গলের মাওবাদীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন? ছিলেন হয়ত! যদিও আইনের চোখে সেটা কোনও অপরাধ নয়। খনিজ উত্তোলনের নামে জঙ্গলের ভূমিপুত্রদের জীবন উপড়ে ফেলার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতেন। উন্নয়নের নামে কর্পোরেটের মামাবাড়ির আবদারে বাগড়া দিতেন।
কী অভিযোগ আনা হলো তাঁর বিরুদ্ধে? অভিযোগ সাংঘাতিক। মাওবাদী যোগসাজস আর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ষড়যন্ত্র। ভাবা যায়! রাষ্ট্র কাকে বলে? রাষ্ট্র আর দেশের কী পার্থক্য? না, এইসব প্রশ্ন তখন ওই পুলিশ বাহিনীকে কেউ করেনি।
যেমন কেউ প্রশ্ন করেনি নাগপুরের জেলের জেলার সাহেবকে। কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করেনি, একজন ৯০% শারীরিক প্রতিবন্ধীকে আন্ডা সেলে রাখা হচ্ছে কেন? জেলের ভেতর এই মানুষটা কী এমন করতে পারেন যার জন্য কুখ্যাত আন্ডা সেল? যে সেলে হাওয়া বাতাস ঢুকতে পারে না ভালো করে। চব্বিশ ঘন্টা তীব্র বৈদ্যুতিক আলো জ্বলে ডিমের আকারের এই সেলে। যিনি সম্পূর্ণ চলৎশক্তিহীন, তাঁকে হুইল চেয়ার দেওয়া হলো না কেন? এমনকি প্রাতঃকৃত্য সারতেও সহবন্দিদের সাহায্য ছাড়া উপায় ছিল না তাঁর। এমনকি কমোডের ব্যবস্থাও করে দেয়নি মহারাষ্ট্রের কোনও সরকার। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দরজায় দরজায় ঘুরেছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছেন কিন্ত কিছুতেই কিছু হয়নি। কেন্দ্রে ততদিনে মনমোহনের বিদায় ও মোদির অধিষ্ঠান। আর মহারাষ্ট্রে সরকার বদলের সিরিজ চলছে। পৃথ্বিরাজ চহ্বানের একটুকুর ছোঁয়ার পর পাঁচ বছরের জন্য 'কথা শোনাতে' এলেন দেবেন্দ্র ফড়নবিশ, বিজেপি সরকার। তার পরের আড়াই বছর উদ্ধব ঠাকরে। সেই সরকারে কংগ্রেসও ছিল। এই সরকারের আমলে কোভিড কাল। মানুষটা কোভিডে আক্রান্ত হলো। জামিনের আবেদন। নাকচ। কোভিডের সঙ্গে প্যানক্রিয়াসের অসুখ। নরক যন্ত্রণা। চিকিৎসা নেই।
শেষে শিন্ডে সরকারের আমলে বম্বে হাইকোর্ট মুক্তি দিল সাইবাবাকে। মানুষকে ভালোবেসে, দেশের দরিদ্রকে ভালোবেসে ভগ্ন একজন মানুষ দশ বছর পর পৃথিবীর পথে এসে দাঁড়ালেন। বম্বে হাইকোর্ট বললেন, উনি নির্দোষ। আরও বললেন, ওঁর বিরুদ্ধে যা তথ্য পেশ করা হয়েছে তা বেআইনিভাবে যোগাড় করা হয়েছে। তাছাড়া কারও কাছে মাওবাদী পত্রিকা থাকলে সে মাওবাদী হয়ে যায় না। কারও মনে মাওবাদীদের প্রতি মমত্ব থাকাও কোনও অপরাধ নয়। যদি না সে কোনও নাশকতার সঙ্গে যুক্ত হয়। শীর্ষ আদালত সহমত হলো বম্বে হাইকোর্টের সঙ্গে। বাড়ি ফিরলেন বিপ্লবী!
দশ বছর নরকবাসে শরীর বলে আর কিছু ছিল না। গলব্লাডারে স্টোন অপারেশনের পর ইনফেকশনে মারা গেলেন।
স্বস্তি একটাই, আদালত তাঁকে নির্দোষ বলেছিল।
না না, তাঁর কাছে ক্ষমা চায়নি কেউ। যাঁরা তাঁর জীবনে ঘোর অমঙ্গল নিয়ে এল তাঁরা কখনও থমকে দাঁড়িয়ে ভেবেছেন কী করলেন তাঁরা!
ধুর! এইসব আবার হয় নাকি!
আপনারা কী বলেন? কমেন্ট বক্সে যা মনে হচ্ছে লিখুন। আপনাদের মতামত তো দরকার।